১৫ এপ্রিল ২০২৬

ইরানের সামনে ট্রাম্পের পিছু হটা: ‘বিজয়’ নাকি আত্মসমর্পণ?

Logo
বাংলা প্রেস প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম
ইরানের সামনে ট্রাম্পের পিছু হটা: ‘বিজয়’ নাকি আত্মসমর্পণ?

ছাবেদ সাথী'র তাজা ভাবনা

ছাবেদ সাথী

‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ দাবির ভাষণ থেকে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে তুলে দেওয়া এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে একটি বড় কূটনৈতিক জয় এনে দিয়েছেন।

কী ঘটেছিল? হোয়াইট হাউসের জন্য ইরানকে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছিল।

ট্রাম্প দ্রুত একটি ‘জয়’ খুঁজছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন, ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রাথমিক হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে সরিয়ে দিলে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কিন্তু তা ঘটেনি।

বরং প্রত্যাশার বিপরীতে তিনি একটি দৃঢ় ও প্রতিরোধী ইরানের মুখোমুখি হন। ৩৮ দিন পর, যখন অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের নেতৃত্বে সামরিক অভিযান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে ছিল, তখনই ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ও রাজনৈতিক সংকল্প হারিয়ে ফেলেন।

আরও কিছু সময় দিলে এই অভিযান সন্ত্রাসপুষ্ট শাসনব্যবস্থাকে পতনের দিকে ঠেলে দিতে পারত, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারত এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া যেত যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে এগুলোই ছিল ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য।

কিন্তু ৭ এপ্রিল পরিস্থিতি বদলে যায়। ট্রাম্প কৌশলগত ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন এবং পতনের দ্বারপ্রান্তে থাকা ইরানকে কার্যত একটি জয় উপহার দেন।

তিনি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। কিন্তু বাস্তবে এটিকে জয় বলা কঠিন।

ট্রাম্প একটি ‘পিছিয়ে আসার পথ’ খুঁজছিলেন এবং পাকিস্তানি মধ্যস্থতার মাধ্যমে সেটি পেয়েছিলেন। তিনি ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু বা অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি বাস্তবায়ন করতে চাননি যদিও তিনি এমনকি একটি ‘সভ্যতা ধ্বংসের’ মতো চরম মন্তব্যও করেছিলেন, যা অনেকের কাছে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সেই বহুল উদ্ধৃত বাক্যের কথা মনে করিয়ে দেয় ‘একটি শহরকে বাঁচাতে সেটিকে ধ্বংস করা জরুরি হয়ে উঠেছিল।’

হয়তো তা ছিল অতিরঞ্জিত বক্তব্য ‘আর্ট অব দ্য ডিল’-এর অতিরিক্ত বুলি কিন্তু কখনও কখনও শব্দের গুরুত্ব থাকে, আর এটাই ছিল তেমন একটি মুহূর্ত। বিরোধীরা তা দ্রুতই কাজে লাগায়।

এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার, যিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সামাজিক মাধ্যমে এমনভাবে কথা বলছেন যেন তিনি নিয়ন্ত্রণহীন। তিনি সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের হুমকি দিচ্ছেন এবং মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছেন।’

সিনেটর এলিসা স্লটকিনও বলেন, এসব হামলা ‘যুদ্ধের আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ হতে পারে।

যুদ্ধ আইনের অধীনে, সেতু ও অবকাঠামো সাধারণত বেসামরিক সম্পদ হিসেবে সুরক্ষিত যতক্ষণ না তা সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস এসব অবকাঠামো সামরিক কাজে ব্যবহার করেছে, যা এগুলোকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে।

তবুও আলোচনায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব প্রায় পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব ১০ দফা পাল্টা প্রস্তাব দেয়, যা মূলত বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে অক্ষত রাখে।

চুক্তির মূল অর্জন হিসেবে ধরা হচ্ছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করা যা যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবেই অর্জন করতে পারত।

কিন্তু এর বিনিময়ে কী পাওয়া গেল? একটি দুর্বল হলেও টিকে থাকা শাসনব্যবস্থা, যা এখনও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের নিয়ন্ত্রণে।

ইরান এখনো হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে এবং জাহাজ চলাচলের ওপর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তাদের প্রভাব বাড়াবে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৪০ কেজি ইউরেনিয়ামের কোনো হিসাব নেই। পাশাপাশি, ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও অক্ষত রয়েছে।

শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামো অটুট রয়েছে। বাসিজ আধাসামরিক বাহিনী দেশীয় দমন-পীড়ন চালিয়ে যাবে এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর সম্পর্কেও ফাটল ধরেছে, যখন অংশীদার দেশগুলো সামরিক অভিযানে পুরোপুরি সমর্থন দেয়নি।

আলোচনা শুরু হলেও আশঙ্কা রয়েছে, ইরান রাশিয়ার কৌশল অনুসরণ করে দীর্ঘসূত্রতা ও ভাঙা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করবে।

সর্বোপরি, একটি দুর্বল হলেও অটুট শাসনব্যবস্থাকে রেখে দেওয়া অনেকের মতে একটি বড় কৌশলগত ভুল।

ছাবেদ সাথী: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সম্পাদক বাংলা প্রেস।

* কপিরাইট ২০২৬ বাংলা প্রেস। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই উপাদান প্রকাশ, সম্প্রচার, পুনর্লিখন বা পুনর্বিতরণ করা যাবে না।

বিপি/এসএম

[বাংলা প্রেস হলো মুক্ত চিন্তার একটি বৈশ্বিক প্রচার মাধ্যম। এটি স্বাধীনচেতা মানুষের জন্য নিরপেক্ষ সংবাদ, বিশ্লেষণ ও মন্তব্য সরবরাহ করে। আমাদের লক্ষ্য হলো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, যা আজকের দিনে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।]

মন্তব্য (0)

আলোচনায় যোগ দিন

আপনার মতামত শেয়ার করতে এবং অন্যান্য পাঠকদের সাথে যুক্ত হতে দয়া করে লগইন করুন।

এখনো কোন মন্তব্য নেই

Be the first to share your thoughts on this article!

আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন

স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন


স্ট্রিট কিচেন-স্পাইস টাউন

সঙ্গীত একাডেমি


সঙ্গীত একাডেমি