তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে গর্ভবতীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে
বাংলাপ্রেস ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, জন্মগত ত্রুটি এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ঝুঁকি শুধু উষ্ণ বা মরুভূমি অঞ্চলের নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নাতিশীতোষ্ণ ও শীতল জলবায়ুর দেশেও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা একই ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে রয়েছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো অঞ্চলের স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি ঘটলেও গর্ভাবস্থায় বিভিন্ন জটিলতার আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ তাপমাত্রা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছানোর প্রয়োজন নেই। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী ১০০ কোটিরও বেশি নারী এ ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার চিকিৎসক ও গবেষক দর্শনিকা লাখুর অভিজ্ঞতাও বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরেছে। যদিও তার গর্ভাবস্থায় দেখা দেওয়া জটিলতার পেছনে তাপপ্রবাহের ভূমিকা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে গবেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, আগে থেকেই স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা নারীদের ওপর অতিরিক্ত তাপমাত্রার নেতিবাচক প্রভাব আরও বেশি হতে পারে।
বাড়ছে হিট স্টর্মের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব
রয়টার্সের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় টানা পাঁচ দিন তাপমাত্রা ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ১০ শতাংশের মধ্যে থাকলে সেটিকে তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর কোনো তাপপ্রবাহ সর্বোচ্চ বিস্তারের সময় পৃথিবীর অন্তত ১ শতাংশ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে তাকে বলা হয় ‘হিট স্টর্ম’।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৬০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের হিট স্টর্মের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০টি। অথচ চলতি দশকেই এ সংখ্যা ৬৬৫ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বিস্তৃত একটি হিট স্টর্ম প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ এলাকা অতিক্রম করেছিল। এর প্রভাবে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলের মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত হয়েছেন।
মেক্সিকোতে লাখ লাখ শিশুর জন্মসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখেছে, গর্ভাবস্থার শেষ মাসে তাপপ্রবাহ বা হিট স্টর্মের সংস্পর্শে এলে অপরিণত সন্তান জন্মের হার সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
গর্ভাবস্থায় বাড়ছে নানা জটিলতা
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের জনবহুল এলাকায় চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময় থেকেই মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয় দর্শনিকা লাখুর। পরবর্তী সময়ে তিনি ইউনিভার্সিটি অব দ্য উইটওয়াটার্সর্যান্ডের একটি গবেষক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। দলটি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ওপর অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছিল।
গত দেড় দশকে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা একের পর এক রেকর্ড ভাঙার পাশাপাশি গর্ভাবস্থায় তাপপ্রবাহের প্রভাব নিয়েও গবেষণা বেড়েছে। লাখু ও তার সহকর্মীরা এ বিষয়ে প্রায় ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত গবেষণা প্রকাশ করেন।
গর্ভাবস্থায় ঠিক কত ডিগ্রি তাপমাত্রা বিপজ্জনক, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি সীমা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ১৪টি দরিদ্র দেশের ওপর পরিচালিত আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, এর চেয়েও কম তাপমাত্রায় অপরিণত সন্তান জন্ম এবং মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে লাখু ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের মতে, নির্দিষ্ট কোনো তাপমাত্রার চেয়ে একজন নারী যে পরিবেশের তাপমাত্রায় অভ্যস্ত, তার তুলনায় তাপমাত্রা কতটা বাড়ছে, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো এলাকায় গর্ভবতী নারীর বসবাসের স্থানের গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে জন্মগত ত্রুটি, গর্ভপাত এবং প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল জরায়ুর দেয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও বাড়তে পারে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে মায়ের উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া গর্ভাবস্থার একটি গুরুতর জটিলতা। এর ফলে কিডনি বিকল হওয়া, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশ্বে মাতৃমৃত্যুর সাতটির মধ্যে একটিরও বেশি ঘটনার সঙ্গে এ জটিলতার সম্পর্ক রয়েছে।
চীনের ২০ লাখ নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাভাবিক গরমের কারণে প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
আগে থেকেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা নারীরা বেশি বিপদে
গবেষকদের মতে, সুস্থ অন্তঃসত্ত্বা নারীরাও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তবে আগে থেকে শারীরিক অসুস্থতা কিংবা সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা নারীদের ক্ষেত্রে এ ঝুঁকি আরও বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, দরিদ্র নারী, বেশি বয়সে গর্ভধারণ করা নারী, ধূমপায়ী, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত অন্তঃসত্ত্বাদের ক্ষেত্রে তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
দর্শনিকা লাখুর গবেষক দলের প্রধান এবং ইউনিভার্সিটি অব দ্য উইটওয়াটার্সর্যান্ডের মাতৃস্বাস্থ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক ম্যাথিউ চেরসিচ বিশেষভাবে যমজ সন্তান ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘যমজ সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা তাপমাত্রার প্রভাবের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।’
মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন
গবেষকদের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব বাড়তে থাকলে অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও বিস্তৃত হবে। এ সমস্যা কেবল প্রচণ্ড গরমের দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেলেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গর্ভাবস্থায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে মাতৃস্বাস্থ্যসেবায় আবহাওয়া ও তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। বিশেষ করে আগে থেকেই স্বাস্থ্যগত জটিলতায় থাকা অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত গরমের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন গবেষকেরা। সূত্র: রয়টার্স
বিপি > এসপি
আপনি এগুলোও পছন্দ করতে পারেন
সঙ্গীত একাডেমি